চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের হালিশহরে পাঁচ তলা একটি। তার সামনে বাক্সবন্দি অ্যাম্বুলেন্সে প্রবাসী এসএম তারেকের কফিন। মৃত্যুর এক মাস পর বাহরাইন থেকে বাড়ির সামনে লাশ এলেও দেখার সুযোগ মিলছিল না কারো। লাশটি আসার পর থেকেই স্বামীর জন্য কান্না করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম। মায়ের পাশে বসে কান্না করছেন একমাত্র কন্যা তাসনিম তামান্না। বাসা থেকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লাশ দাফনের জন্য নেওয়ার আগে স্ত্রী, কন্যা ও কয়েকজন স্বজনকে কয়েক মিনিটের জন্য তারেকের মুখটি দেখানো হয়। এটি স্বামীর সঙ্গে স্ত্রী-কন্যার শেষ দেখা। এ সময় পুরো বাড়িতে কান্নাররোল পড়ে যায়। সকলের চোখ অশ্রুস্বজল হয়ে পড়ে। ১৮ বছর প্রবাস জীবনে কাটানো তারেক লাশ হয়ে ফিরলেন চট্টগ্রামের বাসায়। স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে।
গতকাল শনিবার হালিশহরে প্রবাসী তারেকের ভাড়া গিয়ে দেখা যায়, বাসার তিনটি কক্ষেই মানুষের ভীড়। তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগমকে সান্তনা দিচ্ছেন আত্মীয়স্বজনরা। রোকেয়া বিলাপ করতে করতে কান্না করছেন। পুরো বাসার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। লাশ দেখার সময় স্ত্রী রোকেয়া স্বামীর লাশের সামনে বলেন, ‘তুমি চলে যাচ্ছো। আমার কী হবে। আমি কাকে নিয়ে থাকবো। আমার মেয়ের কী হবে?’ স্ত্রী-কন্যাকে তারেকের মুখ দেখানোর পর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় কবরস্থানে।
গতকাল শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইনে গত ১ মার্চ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত মোহাম্মদ তারেকের জানাজা চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাযায় যোগ দেন এমপি সাঈদ আল নোমানসহ সাধারণ মানুষ। তারেক দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বাহরাইনে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছিলেন। অবশেষে লাশ হয়ে চট্টগ্রামের নিজ শহরে ফিরলেন তিনি। ১ মাসের বেশি সময় হওয়ায় কফিন না খোলার জন্য বলেছেন চিকিৎসকেরা। এ জন্য রাতে লাশ এলেও কেউ চেহারা দেখতে পাননি।
শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে কফিনবন্দী লাশটি চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের ভাড়া বাসায় পৌঁছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে লাশটি হালিশহরের ঈদগাহ বউবাজার এলাকায় দাফন করা হয়। বাবার চেহারা একনজরের জন্য দেখতে পান একমাত্র মেয়ে তাসনিম তামান্না। এ সময় কন্যা বলেন, ‘বাবাকে একনজর দেখতে পেরেছি, এটিই সান্ত¡না।’ তারেক ২০০৯ সালে বাহরাইনে যান। বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি।
স্থানীয় এমপি সাঈদ আল নোমান বলেন, মোহাম্মদ তারেককে একজন কষ্টসহিষ্ণু প্রবাসী ছিলেন। তিনি বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। মরদেহটি দ্রুত দেশে আনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলাম। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। অসহায় পরিবারটির পাশে থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
এর আগে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বাহরাইনের রাজধানী মানামার কানু মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বজনরা জানান, প্রবাসী তারেকের বাড়ি সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নে হলেও নদী ভাঙনের কারণে তার পরিবার বর্তমানে হালিশহরে বসবাস করছে। তার ঘরে তাসনিম তামান্না নামে এক কন্যা সন্তান রয়েছে। বাহরাইন হয়ে তারেকের মরদেহ সৌদি আরবের দাম্মাম হয়ে শুক্রবার বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তিনি বাহরাইনের রাজধানী মানামার কাছে শিপইয়ার্ড কোম্পানি ‘দ্রাইডকে’ কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন সকালে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ জাহাজের ওপর এসে পড়লে তিনি নিহত হন। বছর দেড়েক আগে ছুটিতে তিনি দেশে এসেছিলেন।
নিহত তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন বলেন, এখনো যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলাকালে এক মাসের মধ্যে লাশ দেশে এসেছে। দেশের মাটিতে কবর দেওয়া হচ্ছে। ভাবী-বাচ্চা ভাইয়ের মুখটি দেখতে পেরেছে এটাই বড় সান্ত¡না। বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা লাশ গ্রহণ করে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। সরকার লাশ দাফন করার জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে, আরও ১০ লাখ টাকা দেবে বলেছেন। স্থানীয় এমপি সাঈদ আল নোমান তারেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। নিহতের মেয়ের পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে হালিশহরের ঈদগাহ বউবাজার এলাকার কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়েছে।
Leave a Reply